হে বন্ধু, হে দেশ বন্ধু, স্বদেশ আত্মার
বাণী মূর্তি তুমি!”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বিশ্বকবি এমন এক ঋষির বর্ণনা করেছেন যাঁর হৃদয় সত্য অন্বেষণে সদাই অনুসন্ধানরত এবং যিনি আত্মাকেই সত্য বলে জেনেছেন!
তিনি অরবিন্দ, এক মহান বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। শৈশব থেকে প্রথম যৌবন অব্দি ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেছিলেন, পরে বরোদাতে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় তিনি বেদ উপনিষদ গীতা রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অন্যান্য ধর্ম শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। হিন্দু ধর্মের গভীর দর্শন ও বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করেন! ধীরে ধীরে অরবিন্দের মন ভগবত্মখী হতে থাকে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। আলিপুর বোমার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং রুদ্ধ কারাগারে থাকাকালীন তাঁর মনে এক ব্যাপক পরিবর্তন হয়।
সেখানে নিভৃতে চলতে থাকে তাঁর ঈশ্বর মনন, বলা হয়ে থাকে এখানেই তিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের দর্শন পান আর রাজযোগ ও হঠযোগ অনুশীলন কালে বিবেকানন্দের সূক্ষ্ম শরীরে দর্শন ও নির্দেশ পান
অরবিন্দ ছিলেন একজন গদ্য সাহিত্যিক ও আধ্যাত্ম্য সাহিত্য বিশ্লেষক। বিশ্বধর্ম সমন্বয়ের প্রচেষ্টা আজীবন তিনি করে গেছিলেন। দুইবার নোবেল পুরস্কার এর জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। প্রথমবার ১৯৪৩ সালে লাইফ ডিভাইন গ্রন্থের জন্য এবং দ্বিতীয়বার ১৯৫০ সালে শান্তি পুরস্কারের জন্য। পন্ডিচেরিতে তাঁর আধ্যাত্ম্য জীবনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। সেখানে মিরা আলফাসা তথা শ্রীমা ওনার এক বিরাট কর্মকান্ডের সাধন সঙ্গিনী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
অরবিন্দ দর্শন মূলত আধ্যাত্মিকতা ও মনস্তত্ত্বের সংমিশ্রণ। শ্রী অরবিন্দ বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন, যেমন প্রাণের সৃষ্টি ও বিকাশ, জড় থেকে কি প্রাণের সৃষ্টি সম্ভব? বিবর্তনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ নয়! তারপরেও তার বিবর্তন সম্ভব, সেই বিবর্তন সম্ভব শুধুমাত্র যোগের মধ্যে দিয়ে মনের নিবিড় অনুশীলন করে এবং সেটি হল অরবিন্দ প্রদর্শিত যোগ! যোগের মধ্যে দিয়ে মানুষের দেহে অতি মানসের অবতরণ ঘটে! মানুষের প্রকৃতির দিব্য পরিবর্তন।
মানুষের জড় প্রকৃতি মনের উত্তরণ অরবিন্দ যোগের মূল কথা। মনের এক অতি উচ্চ অবস্থা আছে যার নাম “অতিমানস”। মানুষের প্রকৃতির সর্বোচ্চ পরিবর্তন অভ্যাস ও মননশীলতায় পরিপক্ক হয়ে ওঠে। মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা যথা তাঁর সঙ্গে চেতনায় যুক্ত হবার চেষ্টা নিজেকে ভগবত্মখী করে মন ও প্রাণকে নিয়ন্ত্রিত করে একমুখী লক্ষ্যের দিকে এগোতে হবে।
যা কিছু ভগবত লাভের বিরোধী তা বর্জন করতে হবে। মনকে স্থির করে প্রাণের বাসনা বামনা লালসা আবেগ দন্ত স্বার্থ হিংসা সব ধীরে ধীরে ত্যাগ করতে হবে।
সংশয়, অবিশ্বাস, কর্ম বিমুখতা ও তামসিকতা বর্জন করতে হবে। শেষে সমর্পণ করতে হবে আমিত্ব কে! সমর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের জড়া প্রকৃতির আমূল পরিবর্তন হবে, অতিমানসিক রূপান্তরে এই আমাদের তনু পরিবর্তিত হবে দেবতনু তে!
এই অতিমানস চেতনার প্রবক্তা ও বিজ্ঞান ভিত্তিক এই মতবাদের সঠিক মূল্যায়ন এবং এটি নিজের শরীরে নামিয়ে এনেছিলেন শ্রী অরবিন্দ ১৯২৪ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর, এটিকে সিদ্ধি দিবসও বলা হয়ে থাকে।
অরবিন্দ যোগে চৈত্যপুরুষের জাগরণ হওয়া অতি আবশ্যক।
হৃদয়ের গুহাকন্দরে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট প্রমাণ যে ধুম্রহীন জ্যোতি বিদ্যমান তাহাই অন্তরাত্মা! চৈত্যপুরুষ হচ্ছে অন্তরাত্মা দ্বারা গঠিত একটি সত্ত্বা যা মন প্রাণ দেহকে পোষণ করে। অতিমানসের উত্তরণ এখানেই সম্ভব!
ঋষি অরবিন্দের তিনটি বৃহৎ আকর গ্রন্থ
দিব্য জীবন (The Life Divine)
বেদ রহস্য (The Secret of Veda)
এবং যোগ সমন্বয় (Synthesis of Yoga)
এছাড়াও সাবিত্রী (Savitri) এক মহান কাব্যগ্রন্থ যা উনি ইংরেজিতে লিখেছেন যা মানবজাতির চিরকালের সম্পদ হিসাবে গণ্য হবে। অরবিন্দ এবং শ্রীমা স্বপ্ন দেখেছেন সারা বিশ্বের মানুষ এক ও অভেদ মনুষ্যত্ব আর ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়ে পরস্পরের কল্যাণকার্যে নিযুক্ত থাকবে। পৃথিবীতে নেমে আসবে দিব্যজীবনে ভরপুর এক বাতাবরণ যেখানে থাকবে শুধু প্রেম ভালোবাসা। আর মানুষ থাকবে দিব্যদেহে দিব্য জীবনে ভরপুর হয়ে।
Copyright © 2024 Conscious Literature All Rights Reserved || Designed & Developed by Picasso Multimedia